
জীবন গতিময়, যেনো বহমান নদীর মত হয়। জোয়ার আসবে, ভাটি লাগবে। ঢেউ-তুফান উঠবে আবার নিরব-শান্ত-নিথর হবে। নদীর বুকের মধ্যে কতকিছু চলছে তা না’য়ের মাঝি জানবে না। যে নদী নিজেকে সামলে নিতে পেরেছে তার বুকেই সভ্যতা তৈরি হয়েছে। কত ঝড়-ঝঞ্ঝা সয়েছে, দু’তীরের বাসিন্দাদের দু’হাত ভরে বিলিয়েছে। অথচ কত নিকৃষ্ট আবর্জনা, অপাংক্তেয়- সেই মানুষেরাই নদীতে ভাসিয়েছে, নিক্ষেপ করেছে অবজ্ঞাভরে।তবু নদী একবারও বাঁধা দেয়নি। বলেনি, আর এসো না। বরং বারবার বলেছে, আমার বুকে নিমজ্জিত হও- পবিত্রতা পাবে। সয়েছে আর বলেছে- আমাকে লাগবে তোমাদের। তৃষ্ণা পেলে পিয়াস মেটানোর জল আমার বুকেই থাকে। এসো, কখনো ভুলে যেও না।
মানুষের জীবনে কতশত ঝড়ঝাপটা, বাঁধা-বিপত্তি আসবে। ভেঙেচুরে চুরমার করে দিতে চাইবে স্বপ্ন। কত মানুষ কত কথা শোনাবে, খোঁটা দেবে কিংবা হাসিমুখে বুকভাঙা আঘাত দেবে। যে মানুষের সামনে প্রশংসা করে তারাই আড়ালে নিন্দার তীর ছুটাবে। শুধু মনে রাখতে হবে, এই সবকিছু শক্ত হয়ে মোকাবেলা করতে হবে। বাস্তবতা থেকে পালানো যায় না। দু’দিনের রেসে জীবন ক্ষয়ে গেলে বেহুশে দৌঁড়ানো যেতো কিন্তু লম্বা জীবনে কৌশল অবলম্বন না করলে টিকে থাকা যাবে না। এখানে যে আগামীকাল দেখে সেই এগিয়ে থাকে।
একশো-দুশো গজ নয় বরং জীবনটা দীর্ঘ সময়ের একটানা ম্যারাথন। কে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারলো সেটাই এখানে মুখ্য। এলাম, দেখলাম এবং জয় করলাম- যোদ্ধার সূত্র হতে পারে কিন্তু জনতার জন্য এসে, দেখে, জয় করে ধরে রাখতে হবে। তেজ দেখিয়ে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে অভীষ্টের দিকে এগিয়ে চলাতেই সফলতা। এখানে যদি ৬০ বছরের জীবন পেয়ে থাকি তবে ২০ বছর দেখতে দেখতে, হাসতে খেলতে কেটে যাবে। বাকি ৪০ বছরের প্রত্যেকটা দিন তোমাকে/আমাকে শেখাবে বাস্তবতা কি? ধরে ধরে দেখাবে জীবনেে মানে। সহস্র তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথে জীবনের ঝুলিতে জড়ো হবে অজস্র রঙিন স্মৃতি। টক-মিষ্টি-ঝাল কীর্তন!
কত মানুষের কত কথা শুনতে হবে। কেউ সাহস দেবে আবার কেউ শক্তি কেড়ে নেবে। আশাহত করার মত বন্ধুর অভাব থাকবে না। বয়স যত বাড়তে থাকবে তত কাঁটা দৃশ্যমান হবে। একা হতে হতে একাকীত্বের নিরঙ্কুশে বসবাস হবে। প্রিয় মানুষের বদলে যাওয়া ভীষণ রকম আঘাত দেবে। কারো ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্য ভাবতে ভাবতে অশ্রু চোখে রাত পোহাবে। বেকারত্বের কালো রঙ হৃদয়ে মাখাতে হবে। স্বজন-সুজনের সুঁচালো কথায় হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাবে। বলার চেয়ে সহ্যের ক্ষমতা যদি না বাড়ে তবে হন্যে হয়ে জীবন থেকে পালানোর পথ খুঁজতে হবে। আমরা কি হারার জন্য জীবন পেয়েছি?
স্বপ্নগুলোকে হত্যা করার দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়েন না। সুখের জন্য পরিশ্রম না করলে নির্বিঘ্নে ঘুমানোর বিছানা মিলবে না। যেদিন পরিশ্রমের ঘাম শরীরে শুকাতে শুরু করবে সেদিন থেকে সফলতার সিঁড়িতে ধীর পদক্ষেপে হাঁটতে শুরু করবেন। চোখ দিয়ে কেউ জল ঝরালে সেটা আড়াল করে ধূলার দোষ দিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর হিম্মত ধরে রাখুন। জীবনের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। যেকোনো পরিবেশে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বাস্তবতা শিখতে শিখতে একদিন আপনাকে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে যাওয়া শিখিয়ে দেবে। নদীর মতো হয়ে নিজেকে সামলাও। বন্ধুর পথ মাড়িয়ে লক্ষ্য ছুঁতে হয়। কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না- মনোবল দৃঢ় করো। জীবনকে জানিয়ে দাও, হেরে যাওয়ার জন্য জীবন ফুরাতে তুমি আসোনি। তোমার এখনো অনেক কাজ বাকি। জীবনের অনেককিছু দেখা বাকি। বন্ধু, হাল ছেড়ো না।



